নয়াদিল্লি : কাশ্মীরে জঙ্গিদের লাগাতার হিন্দুনিধন চালানোর ঘটনায় নড়েচড়ে বসল কেন্দ্র। প্রাণভয়ে উপত্যকা থেকে হিন্দু পণ্ডিতদের পালানো রুখতে তৎপর হল কেন্দ্র।
জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসন তথা নিরাপত্তাবাহিনীর প্রতি কেন্দ্রের কড়া বার্তা, দরকারে উপত্যকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত হিন্দুদের জেলা সদরে বদলি করে নিয়ে আসা যেতে পারে। কিন্তু কোনো পরিবার যেন উপত্যকা ছেড়ে চলে না যায়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশল ঠিক করতে শনিবার।বৈঠকে বসেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) উপস্থিত ছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, সেনাপ্রধান মনোজ পান্ডে, 'র'-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল গোয়েন্দা প্রধান অরবিন্দ কুমার। ছিলেন সিআরপিএফ আর বিএসএফ প্রধানতও।
সূত্রের মতে, বৈঠকে কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন শাহ। কেন বারবার সরকারের মুখ পুড়ছে, তা নিয়ে কৈফিয়ৎ চাওয়া হয়। এ মাসের শেষে শুরু হচ্ছে অমরনাথ যাত্রা। তার আগে যে কোনো মূল্যে উপত্যকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ওপরে জোর দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিন কাশ্মীর প্রশ্নে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলে নর্থ ব্লকে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পণ্ডিতরা যাতে এলাকা ছাড়তে না পারেন, সেজন্য শুক্রবারের মতো শনিবারও পুনর্বাসন শিবির-গুলির সামনে রাস্তা আটকে দিয়েছে নিরাপত্তাবাহিনী। কারণ বিজেপি মনে করছে, কেন্দ্রে তাদের সরকার থাকা সত্ত্বেও পণ্ডিতদের উপতাকা ছাড়তে হলে দেশে ও দেশের বাইরে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ভুল বার্তা পৌঁছোবে।
এদিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রে জঙ্গি দমন অভিযান আরোও তীব্র করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই বড়ো মাপের ধরপাকড়ের শুরু হবে উপত্যকা জুড়ে।
গত কয়েক মাস ধরেই উপত্যকায় বেছে বেছে পণ্ডিত ও হিন্দুদের গুলির নিশানা বানিয়েছে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিরা। ঘটনায় তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে উপত্যকায় বসবাসকারী হিন্দুদের মধ্যে। এদিনও শোপিয়ানের অগলব এলাকায় জঙ্গিদের গ্রেনেডে জখম হয়েছেন অন্য রাজ্য থেকে কাজে আসা ২ শ্রমিক।
কাশ্মীরে বসবাসকারী হিন্দুদের একাংশ নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় পালিয়ে গিয়েছেন বা যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। পণ্ডিতদের দলবদ্ধভাবে এলাকা ত্যাগ রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছে মোদী সরকারকে। কাশ্মীরের হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে মোদী সরকার ব্যর্থ হয়েছে এই প্রশ্নে বিরোধীরা তো বটেই, সরব হয়েছেন স্বয়ং বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীও। হিন্দুদের নিরাপত্তা না দিতে পারায় অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগেরও দাবি করেছেন তিনি।
কংগ্রেসের বক্তব্য, সিনেমা দেখে সময় নষ্ট না করে আরোও আগেই মাঠে নামা উচিত ছিল শাহর। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নীরব কেন, সে প্রশ্নও তুলেছে কংগ্রেস।
এদিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বৈঠকে পণ্ডিতদের সাম্প্রতিক হত্যার পিছনে পাকিস্থানের মদতের বিষয়টি উঠে আসে। সূত্রের মতে, গোয়েন্দা কর্তারা জানান, বেছে বেছে ওই হত্যাকাণ্ড চালিয়ে উপতক্যায় অস্থিরতা চালানোর কৌশল নিয়েছে পাকিস্থান কারণ সীমান্ত আগের চেয়ে অনেক নিশ্ছিদ্র হওয়ায় অনুপ্রবেশ কমেছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি সন্ত্রাসে মদত দেওয়া ইসলামাবাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।এই আবহে কাশ্মীরে জঙ্গি সক্রিয়তা বজায় রাখতে ভরসা এখন স্থানীয়রা। কিন্তু প্রশিক্ষিত সেনা বা আধাসেনার বিরুদ্ধে লড়ার মতো প্রশিক্ষণ তাদের না থাকায় সেনা ছাউনি বা সেনা কনভয়ে হামলার বদলে শিক্ষানবিশ ওই জঙ্গিদের ব্যবহার করা হচ্ছে নিরস্ত্র নাগরিক হত্যার কাজে।
মূলত, জঙ্গি কার্যকলাপকে সাহায্য করার জন্য এই মুহূর্তে কয়েক হাজার ওভারগ্রাউন্ড ওয়ার্কার (OGW)-কে উপত্যকায় সক্রিয় করা হয়েছে। যাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর থেকে। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ওই কর্মীরা আমজনতার মধ্যে মিশে গিয়ে দিন কাটালেও তারা জঙ্গিদের নিয়মিত তথ্য সরবরাহ ও রসদের জোগান দেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রের মতে,স্থানীয় পর্যায়ে কোনো দফতরে কজন হিন্দু কর্মী কাজ করেন, জঙ্গিদের সেই তথ্য সরবরাহের দায়িত্বেও থাকে ওই ওজিডব্লুরাই।
সূত্রের মতে, এ বার ওজিডব্লুদের চিহ্নিত করে আটক করার কাজ শুরু হতে চলেছে উপত্যকায়। মুখ বাঁচাতে উপত্যকা থেকে হিন্দুদের দলবদ্ধভাবে উপত্যকা ছেড়ে পালানো রুখতে জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসনকে কড়া হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র। সূত্রের মতে, দিল্লি জানিয়ে দিয়েছে, কোনোভাবেই যাতে হিন্দুরা পরিবার নিয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। কর্মরত হিন্দু সরকারি কর্মী, যাঁরা উপত্যকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত, দরকার হলে তাঁদের জেলা সদরে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে নিয়ে আসা হবে বলে ঠিক হয়েছে। এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে মোদী সরকারের।পণ্ডিতদের পুনর্বাসন দেওয়ার দাবি।
শনিবার সারা দিনে।জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে মোট ৩টি বৈঠক করেন অমিত শাহ। তার মধ্যে ২টি উপত্যকার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ও তৃতীয়টি ছিল অমরনাথ যাত্রা নিয়ে। কার্যত ২ বছর বন্ধ থাকার পরে এ মাসে ফের শুরু হতে চলেছে অমরনাথ যাত্রা। শনিবার যাত্রাপথে নিরাপত্তার বিষয়টি ছাড়াও যাত্রীদের পরিকাঠামোগত সুবিধে দেওয়ার প্রশ্নে।কাজ কতটা এগিয়েছে, তা খতিয়ে দেখেন শাহ।
সূত্রের মতে, এবারের অমরনাথ যাত্রায় এরমধ্যেই ৫ লাখেরও বেশি মানুষ নাম লিখিয়েছেন। যাঁদের প্রত্যেক-কে একটি করে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি কার্ড দেওয়া হবে। তাতে গোটা পরিস্থিতি নখদর্পণে থাকবে নিরাপত্তা-বাহিনীর। প্রত্যেক ব্যক্তির গতিবিধির ফের কড়া নজরদারি চালাতে পারবে নিরাপত্তা-বাহিনী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Please do not enter any spam link in the comment box.